Blog
ফ্ল্যাটের সঠিক পরিমাপ ও কমন এরিয়া নির্দেশিকা ২০২৫: ক্রেতাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ গাইড
বাংলাদেশে আবাসন খাতের বিবর্তন এবং পরিমাপ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের নগরায়ন প্রক্রিয়ায় ঢাকা একটি অত্যন্ত জনবহুল মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে, যা আবাসন খাতের প্রসারে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত এক দশকে বহুতল ভবনের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ফ্ল্যাটের আয়তন এবং কমন এরিয়া নির্ধারণ নিয়ে গ্রাহক ও ডেভেলপারদের মধ্যে নানা ধরণের আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে ফ্ল্যাট বিক্রির সময় “সুপার বিল্ট-আপ এরিয়া” বা “সালেবল এরিয়া” নামক একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবে গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করত। তবে ২০১০ সালের ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন’ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সরকারি বিধিমালা এই পরিমাপ পদ্ধতিতে একটি আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে ।
২০২৫ সালের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP 2022-2035) এবং প্রস্তাবিত ‘ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫’ আবাসন খাতের দৃশ্যপটকে আমূল বদলে দিচ্ছে 5। এই বিধিমালায় ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’ (FAR) এর মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে 6। এই জটিল আইনি কাঠামোর মধ্যে সফটল্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মতো আধুনিক ডেভেলপার কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকদের সঠিক তথ্য প্রদান এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর 8। একটি ফ্ল্যাটের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য স্থান এবং কমন স্পেসের সুক্ষ্ম হিসেব জানা কেবল গ্রাহকের অধিকার নয়, বরং এটি একটি সফল বিনিয়োগের পূর্বশর্ত।
ফ্ল্যাট পরিমাপের ত্রিপক্ষীয় কাঠামো: কার্পেট, বিল্ট-আপ এবং সুপার বিল্ট-আপ এরিয়া
আবাসন শিল্পে ফ্ল্যাটের আয়তন মূলত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়। এই বিভাগগুলো বোঝার মাধ্যমেই একজন ক্রেতা বুঝতে পারেন তিনি প্রকৃত অর্থে কতটুকু থাকার জায়গা পাচ্ছেন এবং কতটুকু জায়গার জন্য তিনি মূল্য পরিশোধ করছেন ।
কার্পেট এরিয়া (Carpet Area)
কার্পেট এরিয়া বলতে ফ্ল্যাটের ভেতরের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য আয়তনকে বোঝায়। সহজ কথায়, ফ্ল্যাটের যে অংশে কার্পেট বিছানো যায় বা আসবাবপত্র রাখা যায়, তাকেই কার্পেট এরিয়া বলা হয়। রিয়েল এস্টেট রেগুলেটরি অথরিটি (RERA) এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কার্পেট এরিয়া হলো ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ দেয়ালগুলোর মাঝখানের নিট আয়তন। এতে কক্ষের ভেতরের দেয়ালের পুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাইরের দেয়াল, ব্যালকনি বা কমন স্পেস অন্তর্ভুক্ত থাকে না। সাধারণত একটি ফ্ল্যাটের মোট আয়তনের ৬০% থেকে ৭০% হলো কার্পেট এরিয়া।
সুপার বিল্ট-আপ এরিয়া (Super Built-Up Area)
ডেভেলপাররা যখন কোনো ফ্ল্যাট বিক্রয় করেন, তখন তারা সাধারণত সুপার বিল্ট-আপ এরিয়া বা ‘চার্জড এরিয়া’ (Charged Area) উল্লেখ করেন। এটি হলো বিল্ট-আপ এরিয়ার সাথে ভবনের কমন স্পেসের একটি আনুপাতিক অংশ 1। লিফট, সিঁড়ি, লবি এবং অন্যান্য সাধারণ সুবিধাদির জন্য যে জায়গা ব্যবহৃত হয়, তা ভবনের মোট ফ্ল্যাট সংখ্যা বা আয়তন অনুযায়ী ভাগ করে প্রতিটি ফ্ল্যাটের সাথে যোগ করা হয় 2।
কমন এরিয়া বা সাধারণ স্পেসের হিসেব ও আইনি রূপরেখা
বাংলাদেশে ফ্ল্যাটের কমন এরিয়া নির্ধারণের বিষয়টি সরাসরি ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’ এর ধারা ২(২) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত 3। আইন অনুযায়ী, কমন স্পেস হলো রিয়েল এস্টেটের সেই অংশ যা ভবনের সকল মালিকদের যৌথ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত থাকে।
কমন এরিয়াতে যা অন্তর্ভুক্ত থাকে
ভবনের কাঠামোগত স্থিতিশীলতা এবং বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য সকল সুবিধাদি কমন এরিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয় 3। এই উপাদানগুলো হলো:
১. যাতায়াতের স্থানঃ লিফট লবি, প্রধান সিঁড়ি, জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি এবং ছাদের যাতায়াতের পথ।
২. ইউটিলিটি স্থাপনাঃ জেনারেটর রুম, সাবস্টেশন, মিটার রুম, লিফট মেশিন রুম এবং পাম্প হাউজ।
৩. ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাঃ সিকিউরিটি গার্ডের রুম, কেয়ারটেকারের কক্ষ, ড্রাইভার্স ওয়েটিং রুম (টয়লেটসহ), অভ্যর্থনা কক্ষ বা রিসেপশন এরিয়া এবং বিন সেন্টার (ময়লা ফেলার স্থান)।
৪. যৌথ সুবিধাদিঃ কমিউনিটি হল, জিমনেসিয়াম, শিশুদের খেলার জায়গা, প্রার্থনা কক্ষ এবং ভবনের চারপাশে থাকা বাগান বা লন।
কমন এরিয়া থেকে যা বাদ যায়
অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি থাকলেও আইনিভাবে এবং নির্মাণ প্রকৌশলগত দিক থেকে নিচের অংশগুলো কমন স্পেস হিসেবে গ্রাহকের ওপর চার্জ করা যায় নাঃ
১. কার পার্কিং এরিয়া: গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা এবং পার্কিং ড্রাইভওয়ে কমন স্পেসের হিসেব থেকে আলাদা রাখা হয় এবং এটি সাধারণত স্বতন্ত্রভাবে বরাদ্দ বা বিক্রয় করা হয় ।
২. জলাধার: মাটির নিচের পানির টাঙ্কি (Underground Water Reservoir) এবং ছাদের ওপরের পানির টাঙ্কি কমন স্পেসের পরিমাপে আসে না ।
৩. খোলা জায়গা ও রাস্তা: ভবনের সীমানার ভেতরের অভ্যন্তরীণ রাস্তা বা প্যাসেজ এবং ওপেন টেরেস সাধারণত কমন স্পেসের লোডিং ফ্যাক্টরে অন্তর্ভুক্ত হয় না ।
কমন স্পেস গণনার গাণিতিক পদ্ধতি
কমন স্পেস গণনার জন্য সাধারণত ‘লোডিং ফ্যাক্টর’ (Loading Factor) নামক একটি অনুপাত ব্যবহার করা হয়। এটি কার্পেট এরিয়ার ওপর কত শতাংশ বাড়তি জায়গা কমন স্পেস হিসেবে যোগ করা হচ্ছে তা নির্দেশ করে । লোডিং ফ্যাক্টর বের করার সূত্রটি হলো:
সফটল্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড তাদের প্রজেক্টগুলোতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য একটি আদর্শ লোডিং ফ্যাক্টর অনুসরণ করে, যা সাধারণত ২০% থেকে ৩০% এর মধ্যে থাকে। যদি লোডিং ৪০% ছাড়িয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে ভবনে অনেক বেশি বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে অথবা পরিমাপে অসঙ্গতি রয়েছে ।
কমন স্পেস গণনার গাণিতিক পদ্ধতি
Related Posts
ফ্ল্যাট বা জমি কেনার আগে দলিল আসল না নকল বুঝবেন কীভাবে? জেনে নিন ৫টি কার্যকরী উপায়
-
Posted by
admin
- 0 comments